নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো থেকে ঢাকার কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে সরবরাহের পথে ৭২ হাজার লিটারের বেশি জেট ফুয়েল গায়েব হওয়ার ঘটনায় পদ্মা অয়েল পিএলসির কর্মকর্তা মো. সাইদুল হককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। কোম্পানির নীতিমালা অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গায়েব হওয়া জ্বালানির মূল্য পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাঁকে।
এ ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিরা শ্রমিক শ্রেণির হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে শ্রম আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন পদ্মা অয়েলের মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) মীর মো. ফখরউদ্দিন।
তিনি বলেন, রোববার (২৫ অক্টোবর) কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগ থেকে চিঠি দিয়ে সাইদুল হককে সিদ্ধান্তটি জানানো হয়। এর আগে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরে তদন্ত ও কোম্পানির নীতিমালা অনুসারে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গত ১১ মার্চ গোদনাইল ডিপো থেকে চারটি ট্যাংকলরিতে করে জেট এ-১ জ্বালানি কুর্মিটোলা ডিপোতে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু গাড়িগুলো গন্তব্যে না পৌঁছালেও দাপ্তরিক নথিতে সেগুলো ডিপোতে প্রবেশ করেছে এবং জ্বালানি গ্রহণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় ১৩ মার্চ ‘অস্থিরতার মধ্যে উধাও ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল, নেপথ্যে পুরনো সিন্ডিকেট!’ শিরোনামে ঢাকা পোস্টে প্রথম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরদিন ১৪ মার্চ পদ্মা অয়েলের তিন সদস্যের তদন্ত দল কুর্মিটোলা ডিপোতে গিয়ে তদন্ত শুরু করে। দলের নেতৃত্বে ছিলেন উপমহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) মো. শফিউল আজম। অন্য দুই সদস্য ছিলেন ব্যবস্থাপক (পরিচালন) পেয়ার আহাম্মদ ও প্রকৌশলী কে এম আবদুর রহিম।
তদন্তের অংশ হিসেবে দলটি ডিপো ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করে। পাশাপাশি জ্বালানির মজুত পরিমাপ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য নেওয়া হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১১ মার্চ গোদনাইল থেকে ছেড়ে যাওয়া চারটি ট্যাংকলরি কুর্মিটোলা ডিপোতে প্রবেশ করেনি। অথচ ডিপোর প্রবেশপথের নিবন্ধন বইয়ে গাড়িগুলোর প্রবেশের তথ্য ছিল। গাড়িগুলোর নম্বর ৪১-০৭০০, ৪২-০২৫২, ৪১-০৬৪৯ ও ৪১-০৬৯৮। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিটি গাড়িতে প্রায় ১৮ হাজার লিটার করে জ্বালানি ছিল। সব মিলিয়ে ৭২ হাজার লিটারের বেশি জ্বালানির হিসাব পাওয়া যায়নি।
তদন্তে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর সাইদুল হককে কুর্মিটোলা ডিপো থেকে সরিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের ইনচার্জ হিসেবে পদায়ন করা হয়। তাঁর স্থলে দৌলতপুর ডিপোর দায়িত্বে থাকা মো. রিদওয়ানুর রহমানকে পদায়ন করা হয়েছিল।
এরপর ১৬ এপ্রিল পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। তাঁরা হলেন—তৎকালীন কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপক (এভিয়েশন) মো. সাইদুল হক, চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা ছামির উদ্দিন, চেকার আকতার কামাল এবং নিরাপত্তা নায়েক শওকত কাজি।
জানা গেছে, সাইদুল হকের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। গত বছরের ২০ জানুয়ারি তাঁকে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছিল পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ। পরে চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি কুর্মিটোলা ডিপো থেকে ধারাবাহিকভাবে জ্বালানি চুরির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।
কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বিপিসির উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন। সদস্য ছিলেন বিপিসির ব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মো. বদরুল ইসলাম ফকির। পদ্মা অয়েলের প্রকৌশলী কে এম আবদুর রহিম ছিলেন সদস্যসচিব।
কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা পড়েনি। ৮ মার্চ কমিটি কুর্মিটোলা ডিপো পরিদর্শন করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। এই তদন্তের মধ্যেই ডিপো থেকে ফের জ্বালানি গায়েবের ঘটনা ঘটে।
জি বাংলা ডেস্ক